
সাঘাটা (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কামালেরপাড়া ইউনিয়নের বাঙ্গাবাড়ী সেতুসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬০টি কয়লার চুল্লি অন্তত ছয় বছর ধরে চালু রয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধ কয়লার চুল্লির বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান চললেও প্রত্যন্ত এই এলাকায় থাকা চুল্লিগুলো এখনো বহাল তবিয়তে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক স্টেশন থেকে দূরে হওয়ায় পরিবেশ আইন অমান্য করে চুল্লিগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন চার ব্যক্তি। এ নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা ও কথিত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামালেরপাড়া ইউনিয়নের কিংকরপুর গ্রামের বাসিন্দা সাজু মিয়া, লাজু মিয়া, রায়হান ও বারী মিয়া এসব চুল্লি পরিচালনা করছেন। বাঙ্গাবাড়ী সেতুর পাশে ও বাঙ্গাবাড়ী মৌজায় স্থাপিত চুল্লিগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করা হচ্ছে। এতে একদিকে এলাকার গাছপালা ও বনাঞ্চল উজাড়ের আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে ধোঁয়া ও বায়ুদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব চুল্লি উচ্ছেদে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কথা জানা গেছে। সূত্রের দাবি, সাঘাটা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চুল্লিগুলো সাঘাটার সীমানার বাইরে হওয়ায় সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে গোবিন্দগঞ্জ প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলে সেখান থেকে বলা হয়েছে, চুল্লিগুলো সাঘাটা উপজেলার মধ্যে পড়ায় উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন হলো, চুল্লিগুলো যদি সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জের সীমানা নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিনেও সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? এক প্রশাসন অন্য প্রশাসনের সীমানার দোহাই দিলে শেষ পর্যন্ত দায় নেবে কে? আর এই সুযোগে যদি নির্বিঘ্নে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন চলতেই থাকে, তাহলে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে কে?
প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণের জটিলতা কোনোভাবেই পরিবেশের ক্ষতি রোধে নিষ্ক্রিয় থাকার স্থায়ী অজুহাত হতে পারে না। প্রয়োজন হলে যৌথভাবে সরেজমিন তদন্ত, মৌজা ও সীমানার নথি যাচাই এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে প্রায় ৬০টি চুল্লি অক্ষত থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
এতগুলো চুল্লিতে প্রতিদিন শত শত মণ কাঠ পোড়ানো হয়ে থাকলে এর প্রভাব শুধু গাছ কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্বিচারে কাঠ সংগ্রহের ফলে স্থানীয় বৃক্ষসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া আশপাশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে প্রতিদিন ঠিক কত মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে, কাঠের উৎস কোথায়, চুল্লিগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই জরুরি। চুল্লিগুলোর বৈধতা, মালিকানা এবং পরিচালনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জেলার অন্য এলাকায় চুল্লির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও বাঙ্গাবাড়ীতে প্রায় ৬০টি চুল্লি দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার কারণ কী? এগুলোর বিরুদ্ধে আগে কোনো অভিযান হয়েছে কি না, কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা আইনগত বাধা থাকলে তা নিরসনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগের সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি চুল্লিগুলোর অবস্থান ও সীমানা নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রশ্ন এখন একটাই—বাঙ্গাবাড়ীর এসব চুল্লি কি আইনের ঊর্ধ্বে? নাকি দায়িত্বের সীমানা নিয়ে টানাপোড়েনে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বই আড়ালে পড়ে আছে? প্রশাসনের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ দূর করতে হলে কথায় নয়, স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে জবাব দিতে হবে।

প্রতিবেদক 


















