১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাদকের ছোবলে নিভে গেল একটি প্রাণ—ভেঙে গেল মায়ের আজীবনের স্বপ্ন

  • প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: ১২:১৯:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
  • ৫২ বার পড়া হয়েছে

সুলতান আহম্মেদ (সাঘাটা)গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি: এক মায়ের বুকফাটা কান্না: আহিদ ইসলামের মৃত্যু কি শুধু একটি পরিবারের শোক, নাকি সমাজের জন্যও এক কঠিন সতর্কবার্তা?

সন্তান হারানোর শোক কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যে মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে সন্তানের জন্ম দেন, অসংখ্য স্বপ্নে তাকে বড় করে তোলেন, সেই সন্তান যখন অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তখন তাঁর বুকের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা কখনো পূরণ হয় না।

গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার ৬ নং ঘুড়িয়েদহ ইউনিয়নের খামার পবনতাইর গ্রামের মোছাঃ আসমান বেগমের জীবন আজ এমনই এক অসহনীয় বেদনার প্রতিচ্ছবি। তাঁর একমাত্র আশা-ভরসা, ছেলে আহিদ ইসলাম, ২০২৬ সালের ২ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের দাবি, আহিদ দীর্ঘদিন মাদকের আসক্তিতে ভুগছিলেন এবং সেই আসক্তিই তাঁর জীবনের করুণ পরিণতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আহিদকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করা হয়েছিল। মা আসমান বেগম ছেলেকে বোঝাতেন, ভালো পথে ফেরানোর জন্য অনুরোধ করতেন, আত্মীয়স্বজনও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, নেশার অন্ধকার জাল তাকে ক্রমেই পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

আজ সেই বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে অন্য এক দৃশ্য। উঠোনে নেই কোনো হাসি, নেই কোনো কোলাহল। ঘরের এক কোণে ছেলের ছবি, কিছু ব্যবহৃত কাপড় আর স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে ধরে দিন কাটান আসমানী বেগম। কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শুধু একটি প্রশ্ন—”আমার ছেলেটা যদি নেশার পথ থেকে ফিরে আসত, তাহলে কি আজও সে আমার পাশে থাকত?”

প্রতিবেশীরা জানান, ছেলের মৃত্যুর পর থেকে আসমান বেগম প্রায় প্রতিদিনই আহিদ ইসলামের স্মৃতি মনে করে কাঁদেন। তাঁর ঘরের প্রতিটি দেয়াল যেন সেই শোকের নীরব সাক্ষী।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়। কীভাবে একজন তরুণ মাদকের মতো ভয়াবহ আসক্তির মধ্যে জড়িয়ে পড়লেন? কোথা থেকে এলো সেই মাদক? কারা এর সঙ্গে জড়িত? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, তেমনি সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষেরও দায়িত্ব মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন, অর্থনৈতিক স্থিতি, মানসিক শান্তি এবং সামাজিক বন্ধনও ধ্বংস করে দেয়। তাই মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

খামার পবনতাইর গ্রামের এই শোকাবহ ঘটনা আজ একটি বড় শিক্ষা হয়ে সামনে এসেছে। একজন মায়ের বুকফাটা কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাদক কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। সময়মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে আরও অনেক পরিবার এমন অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে।

আসমান বেগমের চোখের জল যেন আর কোনো মায়ের ভাগ্যে না জোটে। আহিদ ইসলামের অসময়ে চলে যাওয়া যেন সমাজকে সচেতন করে, মাদকের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করে—এটাই এখন এলাকার মানুষের প্রত্যাশা।

Tags:

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক সম্পর্কে

শিরোনাম

মহাস্থান মাজার জামে মসজিদে সাবেক এমপি মরহুম সাইদ ইস্কান্দার এর আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল 

মাদকের ছোবলে নিভে গেল একটি প্রাণ—ভেঙে গেল মায়ের আজীবনের স্বপ্ন

প্রকাশিত: ১২:১৯:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

সুলতান আহম্মেদ (সাঘাটা)গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি: এক মায়ের বুকফাটা কান্না: আহিদ ইসলামের মৃত্যু কি শুধু একটি পরিবারের শোক, নাকি সমাজের জন্যও এক কঠিন সতর্কবার্তা?

সন্তান হারানোর শোক কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যে মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে সন্তানের জন্ম দেন, অসংখ্য স্বপ্নে তাকে বড় করে তোলেন, সেই সন্তান যখন অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তখন তাঁর বুকের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা কখনো পূরণ হয় না।

গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার ৬ নং ঘুড়িয়েদহ ইউনিয়নের খামার পবনতাইর গ্রামের মোছাঃ আসমান বেগমের জীবন আজ এমনই এক অসহনীয় বেদনার প্রতিচ্ছবি। তাঁর একমাত্র আশা-ভরসা, ছেলে আহিদ ইসলাম, ২০২৬ সালের ২ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের দাবি, আহিদ দীর্ঘদিন মাদকের আসক্তিতে ভুগছিলেন এবং সেই আসক্তিই তাঁর জীবনের করুণ পরিণতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আহিদকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করা হয়েছিল। মা আসমান বেগম ছেলেকে বোঝাতেন, ভালো পথে ফেরানোর জন্য অনুরোধ করতেন, আত্মীয়স্বজনও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, নেশার অন্ধকার জাল তাকে ক্রমেই পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

আজ সেই বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে অন্য এক দৃশ্য। উঠোনে নেই কোনো হাসি, নেই কোনো কোলাহল। ঘরের এক কোণে ছেলের ছবি, কিছু ব্যবহৃত কাপড় আর স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে ধরে দিন কাটান আসমানী বেগম। কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শুধু একটি প্রশ্ন—”আমার ছেলেটা যদি নেশার পথ থেকে ফিরে আসত, তাহলে কি আজও সে আমার পাশে থাকত?”

প্রতিবেশীরা জানান, ছেলের মৃত্যুর পর থেকে আসমান বেগম প্রায় প্রতিদিনই আহিদ ইসলামের স্মৃতি মনে করে কাঁদেন। তাঁর ঘরের প্রতিটি দেয়াল যেন সেই শোকের নীরব সাক্ষী।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়। কীভাবে একজন তরুণ মাদকের মতো ভয়াবহ আসক্তির মধ্যে জড়িয়ে পড়লেন? কোথা থেকে এলো সেই মাদক? কারা এর সঙ্গে জড়িত? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, তেমনি সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষেরও দায়িত্ব মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন, অর্থনৈতিক স্থিতি, মানসিক শান্তি এবং সামাজিক বন্ধনও ধ্বংস করে দেয়। তাই মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

খামার পবনতাইর গ্রামের এই শোকাবহ ঘটনা আজ একটি বড় শিক্ষা হয়ে সামনে এসেছে। একজন মায়ের বুকফাটা কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাদক কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। সময়মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে আরও অনেক পরিবার এমন অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে।

আসমান বেগমের চোখের জল যেন আর কোনো মায়ের ভাগ্যে না জোটে। আহিদ ইসলামের অসময়ে চলে যাওয়া যেন সমাজকে সচেতন করে, মাদকের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করে—এটাই এখন এলাকার মানুষের প্রত্যাশা।