
আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি: বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে সরকার গ্রান্যুলার ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারে ভর্তুকি দিয়েছেন প্রায় সাড়ে ২১ কোটি টাকা। যার সুফল পায়নি প্রায় ৯০ ভাগ কৃষক। উপজেলায় গ্রান্যনলার ইউরিয়া সার প্রায় সময় সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে। কিন্তু নন-ইউরিয়া সারগুলো সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তা ২৫০ টাকা থেকে ৬০০ শত টাকা বেশি দামে বিক্রি করা যেন নিয়মে পরিনত করেছে ডিলার ও খুচরা ডিলার সিন্ডিকেট। এর মধ্যে শুধু ডিএপি ও টিএসপি সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার মাধ্যমে নিরীহ ও নিরুপায় কৃষকের পকেট থেকে শেষ দুই মাসে লুটে নেয়া হয়েছে প্রায় কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আদমদীঘি উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার রয়েছেন ১০ জন ও শুধু বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার রয়েছেন ১৯ জন। সারাদেশের মত আদমদীঘি উপজেলার বিসিআইসি ও বিএডিসি অনুমোদিত ডিলাররা ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দ পেলেও বিএডিসি অনুমোদিত ডিলাররা শুধু নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দ পায়। আবার বিএডিসি ডিলারদের নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনেক সময় মেলে চোখে পড়ার মত বৈষম্য। বিসিআইসি ডিলাররা নন-ইউরিয়া সারগুলো বিসিআইসি, বিএডিসি ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক বেশি পরিমাণ বরাদ্দ পেয়ে আসছে। আর বিএডিসি ডিলাররা শুধু বিএডিসি ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে বরাদ্দ পায় অনেক কম পরিমাণ। কোন কোন সময় মাত্র ১৬ থেকে ২০ বস্তা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেটাও আবার যশোর জেলার নোয়াপাড়া কখনো বা পাবনার নগরবাড়ি থেকে। ভুক্তভোগী বিএডিসি ডিলারদের দাবি নোয়াপাড়া থেকে আদমদীঘি উপজেলায় প্রতি বস্তা সারের পরিবহন ভাড়া কমপক্ষে ৭০ টাকা। এর সাথে দুই স্থানের লোড ও আনলোড খরচ প্রতি বস্তা কমপক্ষে ২০ টাকা। সেই সাথে ছেঁড়া-ফাটা, পচা ও জমাটবাধা সারের বস্তার পরিবর্তে ফ্রেস বস্তা নিতে লোডিং লেবারদের দিতে হয় প্রতি বস্তা কমপক্ষে ৩০ টাকা। পক্ষান্তরে সরকার ডিলারদের প্রতি বস্তার জন্য কমিশন প্রদান করেন একশত টাকা। চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাসের বরাদ্দপত্র যাচাই করে দেখা যায়, আদমদীঘি উপজেলার ১০ জন বিসিআইসি ও ১৯ জন বিএডিসি ডিলারের অনুকূলে ডিএপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২১ হাজার ৬শত বস্তা, টিএসপি সার ৭ হাজার ৫৪০ বস্তা এবং এমওপি সার ১২ হাজার ৮শত বস্তা। এদিকে ১০ জন বিসিআইসি ডিলারের অনুকূলে ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার বস্তা। সরকার ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ডিএপি সারের জন্য গড়ে ৪ হাজার ৭৫ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ডিলারকে দেয় প্রতি বস্তা ৯৫০ টাকায়। বিক্রি করার নির্দেশ রয়েছে ১০৫০ টাকায়। সরেজমিনে বিগত বোরো ও চলতি রোপা আমন চাষাবাদের ভরা মৌসুমে বিক্রি করতে দেখা গেছে ১ হাজার ৪৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা করে। প্রতি বস্তা টিএসপি সারের জন্য গড়ে ২ হাজার ৭৭৫ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ডিলারকে দেওয়া হয় ১ হাজার ২৫০ টাকায়। বিক্রি করার নির্দেশ রয়েছে ১ হাজার ৩৫০ টাকায়। কিন্তু সব সময় বিক্রি করতে দেখা যায় কমপক্ষে ১ হাজার ৭শত থেকে এক হাজার ৯শত টাকা করে। প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের জন্য সরকার ২ হাজার ২৭৫ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ডিলারকে দেয় ১ হাজার ২৫০ টাকায়। বিক্রি করার নির্দেশ রয়েছে এক হাজার ৩৫০ টাকায়। এই ইউরিয়া সার উপজেলায় প্রায় সময় সরকার নির্ধারিত দামেই বেচাকেনা হতে দেখা যায়। মাঝে মধ্যে চাহিদা ও স্থান ভেদে প্রতি বস্তায় ৫০ থেকে এক শত টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হয় বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। সরকার প্রতি বস্তা এমওপি সারের জন্য ১ হাজার ১২৫ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ডিলারকে দেয় ৯শত টাকায়। বিক্রি করার নির্দেশ রয়েছে এক হাজার টাকায়। এমওপি সার আমদানি করা হয় সাধারণত দুই প্রকার। একটা হল ঝুড়া (রাশিয়া ও অন্য দেশ থেকে আমদানি করা) অপরটি হল দানাদার (কানাডা থেকে আমদানি করা)।
আদমদীঘি উপজেলায় সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষকদের অতি চাহিদা হচ্ছে দানাদার এমওপি সারের প্রতি। ঝুড়া এমওপি সারের প্রতি কৃষকদের অনিহা থাকায় এই সার নিয়ে বিপাকে পড়েন ডিলাররা। এই সুযোগে ডিলার সিন্ডিকেট দানাদার এমওপি সার ১ হাজার ২শত থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকার কমে বেচাকেনা করেন না। এবিষয়ে সব ডিলারদের এক দাবি যে বাফার স্টক গুদাম থেকে দানাদার এমওপি সার নিতে ঘুষ দিতে হয় প্রতি বস্তার জন্য কমপক্ষে ৫০ টাকা। বাফার থেকে প্রতি মাসে কত মেট্টিক টন দানাদার এমওপি সার সরবরাহ করা হয় তার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ফলে ডিলার সিন্ডিকেট দানাদার এমওপি সার বেশি দামে বিক্রি করে নিরুপায় নিরিহ কৃষকের পকেট থেকে কত টাকা লুটে নিয়েছেন সে হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। সরেজমিন অনুসন্ধানে খুচরা ডিলাররা দাবি করেন মুল ডিলাররা সাদা কাগজের স্লিপের মাধ্যমে বেশি দামে নন-ইউরিয়া সার বিক্রি করলেও তারা রশিদ লেখেন সরকার নির্ধারিত দামে। বিষয়টি অনেকটা পশু হাটের টোল আদায়ের মত ঘটনা। তাদের দাবি বেশি দামে সার বিক্রি করার নিত্য ঘটনা প্রমান করার সহজ উপায় হচ্ছে মুল ডিলার ও খুচরা ডিলারদের প্রতিদিনের বেচাকেনা করার আলাদা খাতা যাচাই করা। এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আদমদীঘি উপজেলা কৃষি অফিসার রবিউল ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কোন সার বিক্রি করার কোন সুযোগ নাই বলে দাবি করে বলেন বস্তার গায়ে লেখা সরকার নির্ধারিত দামেই সার বেচাকেনা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন বেশি দামে সার কেনার রশিদসহ কোন সার ক্রেতা লিখিত অভিযোগ করলে সেই ডিলার ও খুচরা ডিলারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। এবিষয়ে কৃষক ও খুচরা ডিলাররা বলেন, যেখানে রশিদই দেওয়া হয় না আবার দিলেও সরকার নির্ধারিত দাম লেখা হয়, সেটা দিয়ে কি করে অভিযোগ করা সম্ভব। এছাড়া কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে পরে ওই কৃষক ও খুচরা ডিলারকে আর সার দেওয়া হয় না। সার পাওয়ার “লোভে” নিরব থাকেন খুচরা ডিলার ও ব্যবসায়ীরা। তারা আরো বলেন, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সদস্য সচিব কৃষি অফিসার এবং কৃষি কার্যালযের সকলকে চেনেন ডিলাররা। এজন্য তারা গেলে সেই সময়ে সঠিক দামেই বেচাকেনা করা হয়। কিন্তু কমিটির অন্য সদস্যদের তো ডিলার ও খুচরা ডিলার চেনেন না। এমন অবস্থায় তাদের মাধ্যমে যাচাই করলেই তো হাতেনাতে প্রমান করা সম্ভব। কিন্তু রহস্যময় কারণে কৃষি বিভাগ কৃষক ও সরকারের স্বার্থে সে ব্যবস্থা গ্রহন করতে দেখে যায় না।

প্রতিবেদক 




















