
আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ বগুড়ার আদমদীঘি ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মিলে না কোনো সেবা এমন অভিযোগ তুলেছেন সেবাগ্রহিতারা। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের। এব্যাপারে সেবাগ্রহিতারা প্রতিবাদ করলে উল্টো বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হয় সেবাপ্রত্যাশীদের। এমনকি একজন সেবাগ্রহিতা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েও তার কোন প্রতিকার তো মিলেই না উল্টো ভুক্তভোগীকে অভিযোগ তুলে নেওয়ার চাপ প্রয়োগ করে বলে জানা গেছে। তাছাড়া বর্তমানে নামজারি আবেদন, খতিয়ান সংশোধন ও মিস কেসের জন্য অতিরিক্ত টাকা না দিলে সেবা মিলছে না। একারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ব্যাঘাত ঘটছে। সম্প্রতি উপজেলার চাঁপাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ লেনদেন বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্র পত্রিকায় নিউজ হলেও তার দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তবে এসব ঘুষ লেনদেন ও অনিয়ম ব্যাপারে বর্তমান দায়িত্বরত সহকারি কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলাম সরাসরি সহকারি ভূমি কর্মকর্তাদের হাতে ফাইল জমা নিয়ে কানুনগোর মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক সেবা প্রত্যাশীরা।
খোজ নিয়ে জানা যায়, আদমদীঘি উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। এর মধ্যে আদমদীঘি সদর, ছাতিয়ানগ্রাম, সান্তাহার, কুন্দগ্রাম, চাঁপাপুর, নশরতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির নামজারি, খতিয়ান দেখানো, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা খাজনা আদায়ের প্রতিটি ধাপে টাকা না দিলে কাজ হয় না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ভূমি অফিস ছাড়া প্রায় ভূমি অফিসে ভূমি উন্নয়ন করের জন্য আবেদন করার পর দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় সেবাগ্রহিতাদের। তবে বর্তমান কর্মরত এসিল্যান্ড আশরাফুল ইসলাম যোগদানের পর থেকে কৌশল পাল্টিয়েছে। প্রতিটি নামজারি আবেদনের নথি ও খতিয়ান সংশোধনের নথি সরাসরি সেবাগ্রহিতাদের নিকট থেকে অফিসে জমা না নিয়ে সংশ্লিষ্ট সহকারি ভূমি কর্মকর্তা ও কিছু চিহ্নিত দালালদের হাতে গ্রহণ করেন এসিল্যান্ড অফিসের কানুনগো আসাদুল ইসলাম। আর সেখানেই চলে ঘুষ লেনদেনের কারবার। যেসব সেবাগ্রহিতারা নিজে নামজারি অথবা খতিয়ান সংশোধনের আবেদন করছেন তাদের ভূমি সেবা পেতে বিলম্বের শেষ নেই। তাছাড়া তহশীলদারদের মাধ্যমে অথবা চিহ্নিত দালালদের মাধ্যমে নামজারি ও খতিয়ান সংশোধনের আবেদন করে কানুনগোর নিকট নথি জমা দিতে হয়। এমনকি তাদের হাতে নথি জমা দিলে কোন কেসের শুনানিও করতে হয় না এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনুচ্ছিক একজন সেবাগ্রহিতা জানান, আমরা সরাসরি ভূমি অফিসে কাজের জন্য আসলে আমাদের কোন কথাই শুনতে চায় না। অথচ সেই কাজ দালাল অথবা সংশ্লিষ্ট সহকারি ভূমি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা সহ কাগজপত্র জমা দিলে কাজ গুলো দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়। তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে আরোও বলেন, আমরা কি এই ঘুষ ছাড়া ভূমি সেবা পাব না।
এব্যাপারে উপজেলার সদরের কুসুম্বী গ্রামের ভুক্তভোগী ময়েন উদ্দিন ও আলম হোসেন জানান, এসব ভূমি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কোন ফাইল নড়ে না। তার প্রমাণ আমরা একই গ্রামের দু’জন। আমরা দীর্ঘ ৮ মাস পূর্বে খতিয়ান সংশোধনের জন্য আদমদীঘি ভূমি অফিসে দিনের পর দিন ঘুরছি। কিন্তু আমাদের কাজ হচ্ছে না। এমনকি আমাদের নথিও কয়েক দফায় হারিয়েছে ফেলেছে। তারা মনোক্ষন্ন হয়ে বলেন, আমরা মনে করেছিলাম আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমল আর নেই। এখন সব কাজ অনলাইন ভিত্তিতে সহজ ভাবে হবে। কিন্তু আমাদের সাধারণ নাগরিকদের আরো ভোগান্তি বেড়েছে। এই হয়রানির বিষয়ে আমরা দুইজনে গত ১লা সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।
এব্যাপারে উপজেলা সদরের তেঁতুলিয়া গ্রামের সেবাগ্রহিতা মুকুল হোসেন জানান, আমি পূর্বের এসিল্যান্ড মাহমুদা সুলতানা থাকতে বাইরের দোকান থেকে আমার সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নামে অনলাইনে নামজারি আবেদন করেছিলাম। তৎকালীন সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার আসলাম আলী জিন্নাহর কাছে প্রস্তাবের জন্য গেলে ৪টি নামজারির আবেদন প্রস্তাব বাবদ আমার কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দাবী করে। কিন্তু আমি তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রতিবাদ করলে তিনি আমাকে নানা ভাবে হয়রানি করায়। এমনকি তৎকালীন কর্মরত এসিল্যান্ড মাহমুদা সুলতানা আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে নানা ভাবে ভয়ভীতি দেখিয়েছিলেন। মনের দুঃখে আমি আজ পর্যন্ত নামজারির জন্য নতুন করে আর আবেদন করিনি।
এব্যাপারে আদমদীঘি সহকারি কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি রেগে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীর সাথে অসৌজন্য আচরণ করে ফোন কেটে দেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুমা বেগম জানান, এসব ঘুষ লেনদেন বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে ঘটনা যদি সত্য হয় তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গত রবিবার দুটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রতিবেদক 










